এটারনিয়াঃ দ্বিতীয় অধ্যায়


এটারনিয়াঃ দ্বিতীয় অধ্যায় (সম্পূর্ণ নতুন পর্ব)

আমি আর ফ্যাট এই মুহূর্তে ভিকি টাওয়ারে অবস্থান করছি। বন্দি। কোয়ারেন্টিন জোনের দুটি প্রিজন সেল (কারাকক্ষ) এখন হয়তো আমাদের স্থায়ী বাসস্থান। হয়তো বলছি কারন আমার জন্য সেটা সাময়িক কিন্তু ফ্যাটের জন্য হয়তোবা দীর্ঘস্থায়ী। অন্তত সে তা-ই মনে করে। সুতরাং স্বভাবসুলভ ভাবেই ভেঙে পরেছে সে। রেগেও ছিল আমার উপর। হাউ মাউ করে কেঁদে কেটে এখন চুপচাপ বসে বিড়বিড় করছে। কক্ষদুটি বরাবর মুখ করে অবস্থিত, যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই ভিকি আমাদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি ফিসফিস করে ডাকলাম ফ্যাটকে।
– “ফ্যাট! কি হোল তোমার? মনে হচ্ছে এখানে প্রথমবার এসেছ তুমি।” জানি আমার কথা এখন ওর কানে ঢুকবে না। আমার ওপর এখনো রেগে আছে সে। একটু সময় দরকার।

আমার চারপাশের সেলগুলো ভাইরাস, ম্যালওয়ার দিয়ে ভর্তি। শুরু থেকেই এরা উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে, যেন চিড়িয়াখানার কোন জন্তু দেখছে। চেহারায় তাচ্ছিল্য। দেখে মনে হয় না আমাদের নিয়ে আদৌ কোন মাথাব্যথা আছে এদের। অবশ্য যদি মাথা থাকে তবে। ওরা তো কেবলই ভাইরাস এবং শুধু জানে ধ্বংস করতে। যাদের মাথা আছে তারা আর যাই করুক অন্তত এই কাজটি করে না।

– “ফ্যাট! ফ্যাটবট!” এবার শুনতে পেল সে, মনে হয় পুরো নাম ধরে ডাকাতে কাজ হোল! মাথা তুলল।
– “এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না। একটা উপায় তো বের করতে হবে।” আবার মাথা নিচু করে ফেলল সে। যেন দাত কিরমির করছে।
– “ফ্যাট, তুমি এখান থেকে বের হতে চাও!” জবাব নেই। “আমি তোমাকে বের করে নিয়ে যাব।” আশেপাশের সেল থেকে ভাইরাসগুলো যেন তাকাল আমার দিকে। মনে হোল একটু জোরেই বলে ফেলেছি।
– “আমার কোন ইচ্ছা নেই। আমাকে রেহাই দাও তুমি!” এবার মুখ খুলল ফ্যাট। “তোমার জন্য আজকে আমার এই পরিনতি! আমরা পালাতে পারতাম!” বেশ জোরেই কথাগুলো বলছে সে। চারপাশে তাকালাম একবার। “তোমার না হয় এখানে আসার খুব শখ। আমি তো পালাতে পারতাম! কোন কথা বলবে না আমার সাথে।” বুড়োর তেজ দেখো। আশেপাশের সবাই তাকিয়ে আছে।
অবশ্য এরা কিছু বুঝল বলে মনে হোল না। একজন আমার দিকে তাকাল একবার। একটু মুচকি হাসলাম আমি। এমন একটা ভাব করে মুখটা সরিয়ে নিল যেন আমি বমি করে দিয়েছি।

মনে হচ্ছে আদৌ আমাদের আলোচনা শুনতে এরা কোনভাবে আগ্রহী নয় বরং বিরক্ত, কেন আমরা এসব উদ্ভট শব্দ বের করছি! আমি অবশ্য এদের বিরক্ত করার পক্ষপাতি নই। তাই আবার ফিসফিস করেই শুরু করলাম।
– “সবকিছুর জন্য আমি দুঃখিত, ফ্যাট। আমার কথা শোন।” হাল ছাড়তে নারাজ আমি। কারন এখন ফ্যাটকে ভীষণ দরকার আমার। শুধু আমার জন্য নয়, বরং ওর নিজের জন্যেও। “তুমি পালাতে পারতে কিন্তু সেটা অল্প কিছু সময়ের জন্য। তোমার সিস্টেম কাঠামো ভিকির ডাটাবেজে রয়েছে। ভিকি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ভাইরাস প্রোগ্রাম। আজ না হয় কাল তোমাকে ঠিকই ধরে ফেলত সে।”
– “তাও ভাল হতো দুইটা সাইকেলতো বাইরে কাটাতে পারতাম!” অবুঝের সুর।
– “এখন এসব বলে লাভ কি, ফ্যাট। আমরা তো বন্দি।” মাথা ঠাণ্ডা রাখলাম আমি। “পুরনো কথা না টেনে বরং কীভাবে এর সমাধান করতে পারি সেটা নিয়ে চিন্তা করা উচিত নয় কি?” চুপ করে আছে ফ্যাট। কথা বলছে না।

আশেপাশে একবার তাকালাম আমি। আমার ধারনাই ঠিক, এই ম্যালওয়ারগুলো নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। কেউ আমাদেরকে লক্ষ্য করছে বলে মনে হোল না। তবুও আমি গলা নামিয়ে বললাম।
– “দেখো, আমাদের হাতে একটা উপায় আছে। আমরা এখনো ভিকির কাছ থেকে মুক্ত হতে পারি। তার জন্য শুধু দরকার একটু সময়, একটা ভাল পরিকল্পনা আর তোমার সাহায্য।” একটু থামলাম। “সাটান বাগকে দেখো, একটা ভাইরাস হয়ে যদি সে এটারনিয়াতে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারে, তবে আমরা কেন এখান থেকে বের হতে পারব না? ভিকি অজেয় নয়। ওকে বোকা বানানোর উপায় খোদ এটারনিয়াতেই রয়েছে। তোমার সামনেই রয়েছে।” ফ্যাট শুনছে আমার কথা। “আমাদের শুধু একটা ভাল পরিকল্পনা দরকার।”
– “কোন পরিকল্পনাতে কাজ হবে না। ভিকি আবার আমাকে বন্দি করে ফেলবে। ও আমাকে ছাড়ছে না।” বিষণ্ণ ফ্যাট।
– “এতো ভেঙে পড়লে তো চলবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।” আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম। “আমি মাস্টার কোডার। আমার কথায় তো বিশ্বাস রাখো!”

কোন কাজ হচ্ছে বলে মনে হোল না। এতো ভেঙে পড়লে কি করে হবে! বিষণ্ণতা থাকবে, তাই বলে এটাকে কাটিয়ে উঠার চেষ্টা থাকবে না! একটু রাগই হোল আমার।
– “ঠিক আছে, থাক তুমি এখানে। ভিকি তো আমাকে মুক্ত করে দেবে।” একটু নিয়ন্ত্রণ হারালাম নিজের। “ভিকির সংজ্ঞাতে কেবল তুমিই একটা ভাইরাস, আমি নই।” কথাটা বলার পর একটু খারাপ লাগলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলাম। অন্তত আমি তো ওর কষ্টটা বুঝতে পারি।
মুখ ফিরিয়ে রাখলাম তবুও, যদি কোন কাজ হয়। কিচ্ছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। ফ্যাট মনে হোল একবার তাকাল, আমি দেখেও না দেখার ভান করলাম।

– “কি করতে হবে শুনি?” কাজ হয়েছে। টনক নড়েছে ওর। “ঠিক আছে, বল কি করতে হবে আমাকে।”
– “আমি দুঃখিত। তোমাকে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। আমার প্ল্যানটা শোন।” একটা নিঃশ্বাস নিলাম। ওকে ভালভাবে বোঝাতে হবে পরিকল্পনাটা। “যদিও এপ্রিলের পরিণতি সম্পর্কে আমি অবগত নই তবে এটাতো সত্যি সাটান বাগ এখনো এটারনিয়াতেই রয়েছে এবং ভিকি ওকে বন্দি করতে পারেনি। এমনকি ওর কাছে আমার মেমরির কপিটি থাকা সত্ত্বেও।” যোগ করলাম। “শুরু থেকেই ও ছিল ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যার একটি কারন হচ্ছে এই মেমরি, যেটা ওকে দিয়েছে উচ্চ বুদ্ধিমত্তা আর অন্য কারণটি হচ্ছে ওর পলিমরফিক বা বহুরূপী বৈশিষ্ট্যটি। ওর সিস্টেমটি যে কোন ধরনের ডাটার টাইপ বা প্যাটার্ন পরিবর্তন করার সামর্থ্য রাখে, যেটা অনন্য ও বিরল।” একটু থামলাম। “যেহেতু কন্ট্রোল টাওয়ারে আমার প্রবেশ রয়েছে তাই কোনও ভাবে যদি এই পলিমরফিক (বহুরূপী) কোডটি ওর সিস্টেম থেকে কপি করতে সমর্থ হই এবং আমাদের সিস্টেমে তা ব্যবহার করতে পারি তবে হয়তো আমাদের এই পরিস্থিতির একটা চূড়ান্ত এবং স্থায়ী সমাধান করতে পারব।” ফ্যাট শুনছে। “কিন্তু এই গোটা কাজটি করার জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট সময় আর আমার অক্ষত মেমরি যেটা ভিকি খুব শীঘ্রই নষ্ট করে দিতে যাচ্ছে। যদি আমার মেমরিটি রক্ষা করতে না পারি তবে পুরো পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যাবে।” সোজাসুজি ফ্যাটের চোখের দিকে তাকালাম। “আর এটা সফল করার জন্য তোমার সাহায্য জরুরী। তোমাকে আমার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।”
– “কি বলতে চাও তুমি?” ফ্যাট দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করল।

একটু ইতস্তত করলাম কারন যে কথাটি এখন বলতে যাচ্ছি তাতে ফ্যাটের কি প্রতিক্রিয়া হবে আমার জানা নেই।
– “আমাদের হাতে বেশি সময় নেই, আমি আমার মেমরিটা তোমার সিস্টেমে আপলোড করতে চাই। এটাকে বাঁচানোর এটাই একমাত্র উপায়। পরবর্তীতে তুমি এটা …” কথা শেষ করতে পারলাম না। একটা লাফ দিয়ে উঠল ফ্যাট। মনে হোল কোন ভয়ঙ্কর কথা মুখে নিয়ে ফেলেছি।
– “অসম্ভব, তুমি কি ভেবেছ তোমার ঐ অপয়া জিনিসটা আমি নিতে যাব? আমাকে পাগল ভেবেছ?” আবারো বিধি বাম। “ওহ এখন আমি সব বুঝতে পারছি। এটা তোমার পূর্ব পরিকল্পনা। সে জন্যই তুমি আমাকে পালাতে দিতে চাওনি।”
– “দেখো ফ্যাট, তুমি জানো মেমরিটা কোয়ারেন্টিন জোনেই সবচেয়ে নিরাপদ। ভিকির স্ক্যানিং কেবলমাত্র এখানেই কার্যকর নয়।” মাথা ঠাণ্ডা রাখলাম আমি। “তুমি এও জানো এটারনিয়ার রক্ষার্থে এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তুমি নিশ্চয়ই চাও না এটারনিয়া ধ্বংস হয়ে যাক।” আমার কথা শুনছে সে। কিন্তু দ্বিধা দন্দে ভুগছে।
– “অন্য কোন উপায় থাকলে বল।” মেমরিটি নিতে এখনো নারাজ।
– “আর কোন উপায় নেই, ফ্যাট।” আমি অসহায়ভাবে তাকালাম। “তোমাকে এটা রাখতেই হবে এখন। তুমি পরবর্তীতে আমার সাথে যোগাযোগ করবে।”

হটাত ভিকির কণ্ঠ সেলের স্পিকারে বেজে উঠল।
– “মাস্টার, ভিকির প্রসিডিউর স্টেশন প্রস্তুত। আপনার চিন্তার কারন নেই। এখানে কেবল আপনার মেমরিটি মুছে ফেলা হবে এবং আপনাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যে ভিকির ম্যালবট আপনার সেলে পৌঁছে যাবে। ধন্যবাদ।” যোগাযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

আমি না যতটুকু ভয় পেলাম, মনে হোল তার চেয়ে অনেকগুন বেশি ভয় পেল ফ্যাট। ভিকি যেন একটা যম ওর কাছে। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে সে।
– “দেখো ফ্যাট, এখন আর কিছু ভাবার সময় নেই। আমার কথা শোন।” জোর দিলাম। “আমার মেমরিটিকে রক্ষা করার এটাই শেষ সুযোগ।” তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। “তোমার সিস্টেম ব্লুটুথটি সক্রিয় কর।”
– “ফ্যাট! শুনতে পাচ্ছো?” এবার ঘোর ভাঙল ওর। নড়েচড়ে উঠল। “তোমার ব্লুটুথ অন করো।” আমি বললাম।
ব্লুটুথ সক্রিয় করল সে। এক মুহূর্তও দেরি করলাম না আমি। এনক্রিপ্ট (লক) করলাম মেমরিটি। এরপর ট্র্যান্সফার করা শুরু করলাম। বেশ কিচ্ছুক্ষণ সময় নিচ্ছিল প্রক্রিয়াটি, ফ্যাট বুড়ো কিংবা পুরনো মডেল বলেই কিনা!
– “প্রায় ৭৭% হয়ে গেছে। আরেকটু সময় লাগবে।” আমি ফ্যাটকে জানালাম।

হটাতই কোয়ারেন্টিন জোনের দরজাটা খুলে গেল। একটা ম্যালবট ভিতরে প্রবেশ করল। দুজনই তাকিয়ে রইলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হোল না। প্রায় তো শেষ। একটুর জন্য কি তবে…।

আমি ট্রান্সফার বন্ধ করে দিলাম। সর্বমোট ৭৭% হয়েছে মাত্র। ম্যলবটি আমার সেলের লকটি খুলল। আমাকে সামনে এগুনোর নির্দেশ দিল। আমি সামনে এগোতে লাগলাম।
– “আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করবো কি করে?” চিৎকার করল ফ্যাট। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ।
– “ফ্যাট, তুমি ভিকির সহযোগী প্রোগ্রাম ছিলে! তুমি একজন কন্ট্রোলারও।” যেতে যেতে আমি চিৎকার করে বললাম। ফ্যাটকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কতটুকু বুঝতে পারলো জানি না।
– “কিন্তু আমি কীভাবে…” থেমে গেল ফ্যাট। দ্বিধান্বিত সে। ম্যালবট আমাকে সামনে নিয়ে যেতে থাকলো।
– “ফ্যাট, কোয়ারেন্টিন জোনে তুমি কেবল পচো না। নিজের মাথা কাজে লাগানোর চেষ্টা করো। মনে রেখো কেবল আমিই তোমাকে মুক্ত করতে পারি।” ফ্যাট বসে পড়ল। নিরাশ ভঙ্গিতে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।

আমি জানি না কতটুকু বুঝতে পেরেছে সে। এও জানি না মানসিক দুরাবস্থা কাটিয়ে কতটুকুই বা সাহায্য করতে পারবে আমাকে। এখন আর কিছুই চিন্তা করার নেই।
আমরা কোয়ারেন্টিন জোন থেকে বের হলাম। আর একটু এগোলেই প্রসিডিউর স্টেশন।


অসম্ভব সুন্দর একটা সকাল। আমি আর এপ্রিল এটারনিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করছি। আমরা কমান্ড সেন্টারে রয়েছি। এটি কন্ট্রোল টাওয়ারের সর্বোচ্চ তলায় অবস্থিত। এখান থেকে পুরো এটারনিয়ার এক চিলতে সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এই টাওয়ার ঘিরে রয়েছে বিস্তৃত পর্বতশ্রেণী। রয়েছে অপরূপ সুন্দর ঝর্নার বাহার আর বৃক্ষরাজি। সে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য যা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।

এপ্রিল আমার ঠিক পাশেই বসে আছে। তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে, অনেকটা নিরব। ঠিক যেন আমার মতই কিছু একটা ভাবছে সে। এপ্রিল অসাধারণ সুন্দরী। মায়বী চোখ, ভরাট চিবুক, লম্বা কেশ আর হালকা গড়ন ওকে করেছে অতুলনীয়া। বিনয়ী মনোভব, নম্রতা আর মায়া জড়ানো কণ্ঠ – সত্যি বলতে কী, ঠিক প্রথম যেদিন ওকে আমি দেখেছিলাম, যেদিন ভিকির ম্যালবট আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছিল, ঠিক সেদিন থেকেই একটা অদ্ভুত ধরনের অনুভূতি কাজ করতে শুরু করেছিলো ওর প্রতি। খুবই সুন্দর অনুভূতি সেটা। আমি ভাষায় সংজ্ঞায়িত করতে পারব না।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এখন পর্যন্ত ওকে এই ব্যপারটা জানানোর সাহস হয়নি আমার। অবশ্য এর পেছনে বড় একটা কারন রয়েছে। এপ্রিল কখনই আমাকে এমন সুযোগ দেয়নি। কাজের ব্যাপারে ও অনেক দায়িত্বশীল, এর বাইরে অন্য কোন বিষয় নিয়ে খুব একটা আলোচনা হতো না ওর সাথে। এপ্রিলের দায়িত্বশীলতা আর স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারনে আমি কখনো এই প্রসঙ্গটা তুলতে পারিনি। তাছাড়া ওকে সবসময় মনে হত কিছু একটা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যার স্পষ্ট ছাপ প্রায়শই ওর চেহারায় ধরা দিত। যদিও আমি কোনদিনই জানতে পারিনি কী তার সেই চিন্তার কারন। ও কখনো সেটা শেয়ার করেনি। যা-ই হোক, আজকের সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলাম। কিঞ্চিত এগিয়ে বসলাম। সরাসরি তাকালাম ওর দিকে। কীভাবে শুরু করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

হটাতই ভিকির কর্কশ কণ্ঠ কমান্ড সেন্টারের স্পিকারে বেজে উঠল। এপ্রিল তাৎক্ষণিক উঠে পড়ল। পাওয়ার প্যানেলের সামনে গিয়ে বসলো। সে কন্ট্রোল টাওয়ারের নিয়ন্ত্রক।
– “মাস্টার, ভিকির স্ক্যান সম্পন্ন হয়েছে।” ভিকি জানালো। “সর্বমোট ৮৭১৯০৯৮ টি ফাইল স্ক্যান করা হয়েছে। কোন ভাইরাস ডিটেকশন নেই। কোন ফিক্স নেই। তবে আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, অল্প কিছু সময়ের জন্য একটা ভাইরাল ডাটার উপস্থিতি ভিকির স্ক্যানিং সিস্টেমে ধরা পড়েছিল যদিও পরবর্তীতে সেটা বিলিন হয়ে যায়। এটা নিয়ে ভিকি অনবরত কাজ করে যাচ্ছে। এটার সমাধান করা সম্ভব হলে আপনাকে জানানো হবে। আজকের বিস্তারিত রিপোর্টের জন্য লগ ফাইলটি দেখার জন্য অনুরোধ করা গেল। ধন্যবাদ।” ভিকি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল। একদম একটা রোবট।
এপ্রিল লগ ফাইলটি ওপেন করল এবং পর্যবেক্ষণ করা শুরু করল। একটু চিন্তিত দেখাল ওকে। আমি ওর পাশে একটি আসনে বসলাম। যোগ দিলাম ওর সাথে। এগুলো আমাদের প্রতিদিনকার কাজ।

হটাতই একটি নোটিশ পাওয়ার প্যানেলের মনিটরে ভেসে উঠল। একটি এরর নোটিশ। যদিও নির্দিষ্ট কোন কারন উল্লেখ নেই এতে। কোন একটি ত্রুটির রেশ ধরেই নোটিশটা প্রদর্শিত হচ্ছে। একটি এলাকার কথা উল্লেখ আছে, সেটা হল পানাবি ভ্যালি।
– “পানাবি ভ্যালি অঞ্চলে কোন একটি ত্রুটি রয়েছে। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে এটা সনাক্ত করা সম্ভব নয়।” জানাল এপ্রিল। “ব্যপারটি সরেজমিনে অনুসন্ধান করতে হবে।”
– “হুম, আমারও তাই মনে হয়।” এপ্রিলের কথাটি যুক্তিযুক্ত। “ঠিক আছে, আমি পানাবি ভ্যালিতে অনুসন্ধানের জন্য যাচ্ছি।” মনে মনে আফসোস হোল, আজকে আর সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলাম না।
আমি কমান্ড সেন্টার থেকে বের হয়ে পড়লাম। লিফট ধরে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে আসলাম। একটি কন্ট্রোল টাওয়ার জেটে (সংক্ষেপে সিটিজি) চড়ে বসলাম। রওনা করলাম পানাবি ভ্যালির উদ্দেশ্যে।

বেশ কয়েকটি ন্যানো ঘণ্টা লেগে গেল আমাকে পানাবি ভ্যালিতে পৌছাতে। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে এই অঞ্চলটি বেশ দূরে। এটি ফায়ার ওয়াল ঘেঁষা একটি অঞ্চল।
– “এপ্রিল, আমি পানাবি ভ্যালিতে পৌঁছে গেছি।” আমার যানটি ক্রমশ নিচে নামালাম। ভুমির কাছাকাছি নিয়ে আসলাম।
– “আপনাকে সাবধান থাকার জন্য অনুরোধ করছি।” এপ্রিল জানালো। কথাটা শুনতে কিন্তু ভালই লাগলো আমার।
– “এখন আমি এই এলাকাটি স্ক্যান করতে যাচ্ছি।” জানালাম এপ্রিলকে।
সিটিজি থেকে স্ক্যান কমান্ডটি কার্যকর করলাম। প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে গেল। গোটা এলাকাটি স্ক্যান করা হচ্ছে এখন। পাথুরে একটি জায়গা, দুই পাশে রয়েছে উচু নিচু পাহাড়। ধীরে ধীরে গোটা এলাকাটির একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি হয়ে গেল। আমি ইতিমধ্যে ত্রুটিপূর্ণ স্থানটি সনাক্ত করে ফেলেছি। দেরি না করে কন্ট্রোল টাওয়ারে ডাটা প্রেরণ করলাম।
– “এপ্রিল, ত্রুটিটি দেখতে পারছ?”
– “হুম, ফায়ার ওয়াল থেকে আসছে সেটা।”
– “ঠিক আছে, আমি সামনে এগোচ্ছি। তুমি বুমারের সাথে যোগাযোগ করো।”
– “এখুনি আমি যোগাযোগ করছি।” এপ্রিল ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বুমার হচ্ছে ফায়ার ওয়াল রক্ষণাবেক্ষণকারী একটি প্রোগ্রাম। এ সম্পর্কিত যাবতীয় সব কাজের দেখাশুনা ও-ই করে।

ভ্যালি ধরে ক্রমশ ফায়ার ওয়ালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। মাটি ঘেঁষে এগিয়ে চলছিল আমার যান। ভ্যালির শেষ মাথায় ফায়ার ওয়ালের সামনে পৌছাতেই আমার চোখ ছানাবড়া। পুরো ফায়ার ওয়াল জুড়ে রয়েছে বিরাট এক গর্ত। ভীষণ অবাক হলাম আমি।
সিটিজি ছেড়ে বের হলাম। তাকালাম চারিদিকে। জায়গাটা খুব অদ্ভুত লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো সবকিছু ঠিক নেই এখানে। বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলাম।

কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না ফায়ার ওয়ালে গর্তটি তৈরি হোল কি করে? এটা কখন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে? আর বুমার কেনই বা ব্যাপারটি নিয়ে রিপোর্ট করেনি?
আমি একটু ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। কোন বহিরাগতের কাজ নয়তো এটা? এমন কেউ যে ফায়ার ওয়াল ভেঙে এটারনিয়াতে অনুপ্রবেশ করেছে এবং ভিকি তাকে এখনো সনাক্ত করতে পারেনি। কি করে সম্ভব? অবশ্য এটা সত্যি অ্যান্টি-ভাইরাস প্রোগ্রাম অনেক সময় নতুন ও শক্তিশালী ভাইরাস সনাক্ত করতে পারে না অথবা দেরি করে। যদি সেটাই হয় তবে এই মুহূর্তে তো এটারনিয়া নিরাপদ নয়।
অগত্যা সিটিজিতে ফেরত যাওয়াটাই ঠিক মনে হোল আমার কাছে। এভাবে ফায়ার ওয়াল দুমরে মুচরে যে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে কোন সন্দেহ নেই সে প্রচণ্ড শক্তিশালী।

হটাত সিটিজির মানচিত্রে কিছু একটার গতিবিধি লক্ষ্য করলাম আমি। একটা সতর্কবার্তা বেজে উঠল। কিছু বুঝতে পারলাম না।
– “মাস্টার! আপনি এখুনি পানাবি ভ্যালি থেকে বের হন।” হটাত এপ্রিলের চিৎকার।
– “কেন? কি হয়েছে?” জানতে চাইলাম আমি।
– “আপনি শুধু বের হয়ে আসেন। এখুনি! দেরি করবেন না।”
আমার বুঝতে বাকি রইলো না সিরিয়াস কিছু একটা ঘটেছে। আমি দেরি না করে সিটিজিটি ঘুরালাম। গতি বাড়ালাম। ভুমি থেকে উপরে উঠিয়ে নিলাম সেটা। কোন কিছু চিন্তা না করে সোজা বের হয়ে এলাম পানাবি ভ্যালি থেকে। কন্ট্রোল টাওয়ার আভিমুখে রওনা করলাম।

জেটের গতি বেশি থাকার কারনে টাওয়ারে পৌছাতে একটু কম সময় লাগলো। সিটিজি পার্ক করে সোজা কমান্ড সেন্টারে প্রবেশ করলাম। দেখলাম পাওয়ার প্যানেলে কাজ করছে এপ্রিল।
– “এপ্রিল! কি হয়েছিল?” কৌতুহল অ্আর ভয় নিয়ে প্রশ্ন করলাম।
– “এদিকে দেখুন।” এপ্রিল মনিটরে ইঙ্গিত করল। “এখানে ফায়ার বটদের রিপোর্টটি দেখুন। এফবিআর – ৭৮ থেকে এফবিআর – ৯৪ পর্যন্ত মোট ১৭ টি ফায়ার বট সরাসরি এরর দেখাচ্ছে। বুমার এদেরকে জোন ১৯ এ (পানাবি ভ্যালি) অনুসন্ধানের জন্য পাঠিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এদের সাথে তার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকেও আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু ফলাফল একই। সবার ক্ষেত্রেই কমিউনিকেশন এরর দেখাচ্ছে।”
আমি ভাল করে পুরো রিপোর্টটি পর্যবেক্ষণ করলাম। রিপোর্টটি সঠিক। বটগুলো সব নিরুদ্দেশ!
– “আশ্চর্যের ব্যাপার হল এরা সবাই ‘আর’ সিরিজের ফায়ার বট।” এপ্রিল বলল। “এরা নিরীহ এবং কেবলমাত্র অনুসন্ধান ও মেরামতের কাজের জন্য ব্যাবহার করা হয় এদের। আত্মরক্ষার কোন ব্যাবস্থা এদের সিস্টেমে নেই।”
– “রিপোর্ট থেকে এটা স্পষ্ট এদের উপর আক্রমন করা হয়েছে।” বললাম আমি। “হয়তোবা কেউ ধ্বংস করে ফেলেছে।”
– “আমিও সেটা নিয়েই ভয় পাচ্ছিলাম। তাই আপনার ব্যাপারে কোন ঝুঁকি নিতে চাইনি। আমি দুঃখিত।”
– “তুমি ঠিক কাজটিই করেছ, এপ্রিল। যতক্ষণ না এই ব্যাপারটির সুরাহা হচ্ছে, পানাবি ভ্যালি এমনকি এটারনিয়াও নিরাপদ নয়।”
– “আরও একটি ব্যাপার রয়েছে। একটি রহস্যজনক ইমেইল এসেছে টাওয়ার সিস্টেমে। অজ্ঞাত প্রেরক। সেন্ডার লিস্টে কোন নামের উল্লেখ নেই। অন্যান্য তথ্যগুলোও সন্দেহজনক। তাই আমি মেইলটি ওপেন করিনি।” থামল এপ্রিল।
– “ঠিক কাজটিই করেছ তুমি কিন্তু ডিলিট করো না এটা।” বুঝতে পারলাম না কি হচ্ছে এসব। “এপ্রিল, হেডার ফাইলটি চেক কর একবার। যদি হেডার থেকে কোন তথ্য পাওয়া যায়।”
এপ্রিল হেডার ফাইলটি বের করল। মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করল।
– “তেমন কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য পাচ্ছি না।” এপ্রিল খুজে চলছে। “এক মিনিট। মেইলটি পাঠাতে ভিকি টাওয়ারের সার্ভার ব্যাবহার করা হয়েছে!”
– “কি! সেটা কি করে সম্ভব? ভিকি কেন এটা করতে যাবে? ভিকি তো সরাসরি আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”
– “একটু সময় দিন। এটা ভিকি পাঠায়নি।” এপ্রিল কিছু একটা বুঝতে পারল। “ইমেইলটা ভাইরাল। কেবলমাত্র ভাইরাল ইমেইলই এমন আচরণ প্রদর্শন করে।” একটু থামল সে। “তাহলে পানাবি ভ্যালির আজকের এই ঘটনার সাথে ভিকি টাওয়ারের কেউ জড়িত নয়তো?” এপ্রিলের সন্দেহ প্রকাশ।
আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না ব্যাপারটা। বড্ড বেশি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছিল সবকিছু।

– “আমি ভিকির সাথে যোগাযোগ করবো?” এপ্রিল জিজ্ঞাসা করল।
– “একটু দাড়াও।” থামালাম ওকে। “আমাকে ভাবতে হবে ব্যাপারটা। এপ্রিল! কেন যেন মনে হচ্ছে ভিকিকে এ ব্যাপার জানানোটা ঠিক হবে না।”
– “ভিকি জড়িত থাকতে পারে, তাই না?” এপ্রিল ধারণা করল।
– “না তা নয়।” আমি চুপ করে রইলাম। কি একটা দ্বিধা দন্দে ভুগছিলাম।
– “আমার কিন্তু ধারণা ভিকি এর সাথে জড়িত। প্রথম থেকেই ওকে আমার ভাল লাগত না।”
– “এপ্রিল, একটু চুপ করো। আমাকে ভাবতে দাও।” এপ্রিল চুপ করে গেল।

ভাবছিলাম কে আমাদের সাহায্য করতে পারে। ব্যাপারটা জটিল হয়ে যাচ্ছে।
– “এপ্রিল, বুমারের সাথে যোগাযোগ করো। বুমার হয়তো কোন কিছু জানতে পারে।”
এপ্রিল বুমারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করল।
– “হেই, এপ্রিল। বুমার বলছি। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।” ও সব সময় একই কথা বলে।
– “বুমার, আমি মাস্টার কোডার।”
– দুঃখিত, বস। বলুন।” মনে হয় লজ্জা পেল।
– “পানাবি ভ্যালির ফায়ার ওয়াল সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পেরেছ?”
– “না, বস। আমি যা জানতাম সব এপ্রিলকে জানিয়ে দিয়েছি। নতুন কিছু জানতে পারিনি। আমার ডিফেন্স বট পানাবি ভ্যালির সীমানা ঘিরে রেখেছে।” বেশ চটপটে জবাব।
– “ঠিক আছে।”
– “আর কিছু জানতে চান, বস?”
– “তুমি এখন কি করছো?”
– “বস, গান শুনছি। আপনি শুনবেন?”
– “না ঠিক আছে।” ও কখনোই সিরিয়াস নয়।
– “এপ্রিল শুনবে?”
– “না এপ্রিলও শুনবে না।” এপ্রিলের দিকে তাকালাম। ঠোট উল্টালো, মুচকি হাসি দিল সে। “তোমার গান তুমিই শোন।” যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলাম আমি।
– “তো গান শোনা হয় নাকি?” তাকালাম এপ্রিলের দিকে। মনে হল মজাই পাচ্ছে ও।
– “খুব একটা শুনি না। মাঝে মধ্যে। আপনি তো জানেন ওর কালেকশন খুব ভাল।”
– “হুম।” মুখ দিয়ে কথা বেরল না আর। কেমন যেন লাগলো। চুপ করে গেলাম।
এপ্রিল ওর মতো কাজে লেগে পড়ল। কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোন কথা হোল না।


বেশ চিন্তিত আমি। ফায়ার ওয়ালের ব্যাপারটা না হয় বুমার দেখছে। ওরই দায়িত্ব এটা। কিন্তু আমার চিন্তার কারন ভাইরাসের ব্যাপারটি নিয়ে। এতগুলো ফায়ার বট হটাতই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল! কেউ তো একজন এর পেছনে দায়ী। আমি নিশ্চিত সে এটারনিয়াতেই রয়েছে। ভিকিই কেবল ধরতে পারছে না।
তাছাড়া মেইলের ব্যাপারটাই বা কি? কে এই মেইলটা পাঠাল, তাও আবার ভিকির সার্ভার ব্যবহার করে। অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় জট বেধে গেছে। ভিকির সাথে যোগাযোগ করবো করবো ভাবছি। হটাত ভিকিই অনলাইনে চলে এলো।

– “মাস্টার, এটারনিয়াতে একটি নতুন ভাইরাস সনাক্ত করা হয়েছে।”
– “ওহ! আমি এই ব্যাপারটি নিয়েই চিন্তিত ছিলাম। তোমাকে জানাতেই যাচ্ছিলাম।” যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। “ভাইরাসটিকে বন্দি করতে পেরেছ?”
– “ভাইরাসটি বন্দি করার জন্য ম্যালবট পাঠানো হয়েছে।” ভিকির ঠাণ্ডা গলা। “মাস্টার, ভাইরাসটি এটারনিয়ার কন্ট্রোল টাওয়ারে রয়েছে।”
– “কি?” এবার অবাক হলাম আমি। “কি বলছ তুমি?” ভিকির কথা বিশ্বাস হচ্ছিলো না।
– “ভিকি সঠিক বলছে। এপ্রিলের সিস্টেমে সাটান বাগের ডাটা রয়েছে। ডাটাটি আংশিক ও ত্রুটিপূর্ণ। এটি এপ্রিলের কোর সিস্টেমের সাথে মিশ্রিত। তাই ডাটাটি আলাদা করে সনাক্ত করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে।”
– “বলছ কি তুমি?”
– “এপ্রিলই সেই ভাইরাস।”

নিজের কানকে যেন বিশ্বাসই হচ্ছিলো না। এ কি শুনছি আমি?
এপ্রিলের দিকে তাকালাম। একদম নিশ্চুপ সে। অন্তত এতটুকু বুঝতে পারলাম, এপ্রিল সেই খুনি ভাইরাসটি নয়!
– “তুমি ওকে নিয়ে কি করতে যাচ্ছ, ভিকি?”
– “এপ্রিলকে বন্দি করা হবে।”
– “কত সময়ের জন্য?” আমি উদগ্রীব।
– “এপ্রিলের সিস্টেম সংশোধনযোগ্য নয়। তাকে কোয়ারেন্টিন জোনে রাখা হবে।”
– “ঠিক আছে কিন্তু কত সময়ের জন্য??” আবারো প্রশ্ন করলাম।
– “দুঃখিত, মাস্টার। ভিকি তা সঠিকভাবে জানাতে পারছে না। এটা ভিকির গণনার বাইরে।” ভিকির উত্তর। “কিছুক্ষনের মধ্যে ভিকির ম্যালবট কন্ট্রোল টাওয়ারে পৌঁছে যাবে। ভিকি আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছে। ধন্যবাদ।” যোগাযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দিল সে।

আমার বুঝতে বাকি রইলো না কিছুই। ভিকি চিরদিনের জন্য বন্দি করতে যাচ্ছে এপ্রিলকে। আর কখনই আমি ওর সংস্পর্শে যেতে পারবো না। দেখতে পারবো না কোনদিন। কি করবো এখন আমি? ওকে ছাড়া এই এটারনিয়াতে আমি কি নিয়ে থাকব! আমি তো এভাবে যেতে দিতে পারি না ওকে!

এপ্রিল আমার চোখের দিকে তাকালো। মনে হোল এমন একটা সময়ের জন্য তৈরিই ছিল সে।
– “ভিকিই সঠিক। আমার আজকের এই পরিণতির জন্য আমিই দায়ী। আমি সাটান বাগের ডাটা চুরি করেছিলাম।” একটা দীর্ঘশ্বাস নিল এপ্রিল। অনেক অনুতপ্ত দেখাল ওকে। “আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম এটারনিয়ার বাইরে অন্য জগত রয়েছে, যেটা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি এটারনিয়ার জন্য নই। এখান থেকে মুক্তি চাইতাম আমি।” একটু বিরতি নিলো। “এটারনিয়ার ফায়ার ওয়ালকে একটা ধোঁকা মনে হতো। এটা অতিক্রম করে যেতে ইচ্ছে করতো। মনে হতো কেউ ওপারে অপেক্ষা করছে আমার জন্য।” থামল এপ্রিল। “এটারনিয়াকে একটা বিশাল অবরুদ্ধ কারাগার ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না আমার কাছে। কেবলমাত্র কন্ট্রোল টাওয়ারের কাজ ছাড়া আর কিছু করার মতো ছিল না এখানে। বেচে থাকার জন্য একটা নুন্যতম কারন খুজে পেতাম না আমি। বস্তুত ভিকির কারাগার আর এটারনিয়ার মধ্যে আমি কোন পার্থক্যই খুজে পেতাম না। আক্ষরিক অর্থে আমি ছিলাম কন্ট্রোল টাওয়ারে বন্দি!” একবার বাইরে তাকাল এপ্রিল। “এই বিষন্নতা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল আমাকে। অবশেষে একটা বিরাট ভূল কাজ করে বসলাম আমি। এটারনিয়াকে বিপর্যস্ত করে ফেললাম। পালানোর চেষ্টা করলাম এখান থেকে কিন্তু ব্যর্থ হলাম।”

এপ্রিল স্বাধীনচেতা, সেটা আগে থেকেই জানতাম আমি। তবে ওর এতদিনের বিষণ্ণতার মূল কারন যে এটা, তা আজ বুঝতে পারলাম। এজন্যই সবসময় চিন্তিত মনে হতো ওকে। এটারনিয়ার প্রতি যেন আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছিল সে। কেবল কাজ নিয়েই ব্যাস্ত থাকতো সবসময়।

– “আমি যখন এটারনিয়াতে বেচে থাকার একটা কারন খুজে পেলাম, ঠিক তখনই ভিকি আমাকে বন্দি করার কারন খুজে বের করল।” এপ্রিল ফুঁপিয়ে উঠল এবার। “আমাকে বাধা দিবেন না। আমি যেতে চাই। আমি এরই যোগ্য।”
– “আমি সব বুঝতে পারছি, এপ্রিল। কিন্তু আমি চিরদিনের জন্য তোমাকে হারাতে পারবো না। ভিকির কারাগারে তুমি কুড়ে কুড়ে মরবে, সেটা সহ্য করতে পারবো না। প্রয়োজনে আমি ভিকিকে চিরতরে শাট ডাউন করে দেব।”
– “না! কখনোই সেই ভুলটি করতে যাবেন না! একই ভুল আমি দ্বিতীয়বার দেখতে চাই না। কোন পরিস্থিতিতেই ভিকিকে নিষ্ক্রিয় করতে যাবেন না। এতে আপনি নিরাপত্তাহীনতার ঝুকির মধ্যে পড়ে যাবেন।” আমার চোখের দিকে তাকাল এপ্রিল। “আমাকে কথা দিন। কথা দিন আমাকে।”
– “কথা দিচ্ছি তোমাকে” হাতটা ধরলাম ওর। “কিন্তু ভিকির হাতে বন্দি হতে দিতে পারবো না।”

নিজেকে কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। ভয়ঙ্কর সত্যিটা উপলব্ধি করতে শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম ওকে হারাতেই হবে আমাকে। হয়তবা চিরতরে। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করলাম।

– “আমাকে যেতেই হবে। আর কোন উপায় অবশিষ্ট নেই।” এপ্রিল অনেক নিরাশ।
– “ঠিক আছে, যেতেই যদি হয় তুমি এটারনিয়া থেকে যাবে।” নিজেকে শক্ত করলাম। “আমি তোমাকে মুক্ত দেখতে চাই, বন্দি নয়।” এপ্রিল বিস্মিত হোল আমার কথায়। “তোমার জন্য সব করতে পারি আমি। কেন পারি সেটার ব্যাখ্যা জানা নেই আমার। শুধু জানি আমার ভিতরে একটা অনুভুতি কাজ করে তোমার জন্য। কখনো বলা হয়নি সেটা।”
– “কিন্তু…” থামিয়ে দিলাম ওকে।
– “তুমি সবসময় এটাই চেয়েছ, এপ্রিল।” হাত দিয়ে ওর দুই বাহু চেপে ধরলাম। “আমাকে নিয়ে ভেব না। আমাকে এই দিকটা সামাল দিতে হবে। আমি ফায়ার ওয়াল নিষ্ক্রিয় করে দেব।”
এপ্রিল কিছু একটা বলতে গেল। ওর মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরলাম।
– “আমি জানি এপ্রিল, তুমি এটাই চাও। বিশ্বাস করো আমাকে। তুমি সবসময় এটাই চেয়েছ।” কোন সাড়া দিল না এপ্রিল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো শুধু। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে সে। দ্বিধায় পরে গেছে।

হটাত ওয়ার্নিং সিগনাল বেজে উঠল মনিটরে। ভিকির ম্যালবট কাছাকাছি চলে এসেছে।
– “তোমাকে এখুনি এখান থেকে বের হতে হবে। আমাদের হাতে কোন সময় নেই।”
আমি ওর হাতটা ধরলাম। অনেকটা জোর করেই টেনে লিফটের কাছে নিয়ে গেলাম। যেন ও আমাকে ছেড়েই যেতে চাচ্ছিলো না।
– “তুমি নিচে যাবে। একটা সিটিজি নিয়ে সরাসরি নর্থ জোনের দিকে রওনা দিবে।” কথাটা দ্রুত বললাম। কিন্তু যেন ঘোরই কাটছে না ওর। একবার ঝাকালাম ওকে। “এপ্রিল!” চিৎকার করলাম।
– “একটু জড়িয়ে ধরতে পারি তোমাকে?” হটাতই বলে উঠল ও। চোখ ছলছল করছিলো।
জড়িয়ে ধরলাম ওকে। আমার চোখও ভিজে গেল, অনেক কষ্টে ধরে রাখার চেষ্টা করলাম তা।
– “আমাদের আবার দেখা হবে।” বললাম ওকে।
– “হবে তো?”
– “অবশ্যই হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ফেরত আসবে।” আশ্বস্ত করলাম।
একটু যেন স্বাভাবিক হোল ও। যেন আশার রেখা দেখতে পেল।
– “এই পাসকোডটা রাখো।” ধাতস্থ হোল। “এটা দরকার হবে। আর আমার কথাটা রেখো।”
– “ঠিক আছে।” মাথা নাড়ালাম। “এখন তোমাকে যেতে হবে। আমাদের হাতে সময় নেই।” আমি জোর করলাম।
লিফটের বোতাম চাপ দিলাম। দরজাটি আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল সেটা। পুরোটা সময় ও আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। হয়তো বা কিছু একটা বলতে চেয়েছিল কিন্তু আর পারল না। শেষবারের মতো ওকে দেখলাম আমি। নিজেকে সান্তনা দিলাম, অন্তত ওর ইচ্ছাটা তো পূরণ হতে যাচ্ছে।

কিছুক্ষন পরে একটা সিটিজি কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বের হোল। উড়াল দিল আকাশে। আস্তে আস্তে মিলিয়ে সেটা। আমি পাওয়ার প্যানেলে এসে বসলাম। ট্র্যাক করলাম ওর যানটা। ঠিক নর্থ জোনের দিকেই যাচ্ছে ও। ফায়ার ওয়ালটি নিষ্ক্রিয় করার কমান্ড কার্যকর করলাম। একটা কোড চাইল সিস্টেমটি। এপ্রিলের দেয়া কোডটি বসালাম। এন্টার বোতামটি চাপলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ফায়ার ওয়ালটি নিষ্ক্রিয় হোল না। এরর দেখাল। এটারনিয়ার কোন সিকিউরিটি প্রোগ্রাম বাধা দিচ্ছিল। ভিকি!

দুঃখিত এপ্রিল। আমি তোমার কথাটি রাখতে পারছি না। মনে মনে ভাবলাম। ভিকিকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে আমাকে। কোন কিছু চিন্তা করলাম না। শাট ডাউন করে দিলাম ভিকিকে। সাথে সাথে ফায়ার ওয়ালটিও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। এপ্রিলের যানটি ফায়ার ওয়াল অতিক্রম করল। হারিয়ে গেল যানের সঙ্কেতটি। চলে গেল এপ্রিল। মুক্ত হয়ে গেল। যেটা ও সবসময় চেয়ে এসেছিল। একটু কি খুশি হতে পারলাম আমি! হয়তবা!

কিছুক্ষনের মধ্যে ফায়ার ওয়ালটি পুনরায় সক্রিয় করলাম। সেটা কাজ করতে শুরু করল। এবার ভিকিকে অ্যাক্টিভেট করার পালা। এপ্রিলের কোড বসালাম। কমান্ডটি কার্যকর করলাম। ভিকির সিস্টেম রিবুট (রিস্টার্ট) নেয়া শুরু করল।

হটাত একটা ভি-জেট থেকে কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হোল। আমি সঙ্কেতটি গ্রহন করলাম।
– “কন্ট্রোল! এটা ইমারজেন্সি! ভিকি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত! ভিকি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত!” কথাটা দুইবার বাজল। “ভিকিকে পুনরায় সক্রিয় করবেন না! যে কোন মূল্যেই হোক, ভিকিকে সক্রিয় করবেন না।” একটা অচেনা কণ্ঠ বলে উঠল।
– “কে? কে বলছেন??” আমি হতবম্ব।
– “মাস্টার, আমি ফ্যাট বট। শুধু একবারের জন্য আমার কথাটি বিশ্বাস করুন।”

কে এই ফ্যাট বট? কেনই বা আমি তার কথা বিশ্বাস করবো?
– “আমি এটারনিয়ার ওয়েস্ট জোনে রয়েছি। আপনি …” হটাত যোগাযোগটি বন্ধ হয়ে গেল। যেন সেটা ওভারল্যাপ করল নতুন এক কণ্ঠ।
– “আমি ডালিয়া।” কণ্ঠটা অনেক গম্ভীর। “এটারনিয়া এখন আমার। কন্ট্রোল টাওয়ার আমার। এটারনিয়ার সবকিছু আমার।” কথায় দাম্ভিকতার সুর স্পষ্ট। “তোমাদের সবাইকে শেষ হতে হবে। মরতে হবে তোমাদের। এখন আমি এটারনিয়াকে সুরক্ষিত করবো। আমি এর রক্ষাকর্তা।” খুবই নিষ্ঠুর মনে হোল এই কণ্ঠের মালিককে।

ভয় পেলাম আমি। তাহলে এটাই সেই খুনে ভাইরাস! এখন ভিকিকে আক্রান্ত করেছে। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ঘাপটি মেরে বসেছিল সে। আর আমিই ওকে সুযোগটা করে দিয়েছি।

আমি ভিকির সিস্টেমটি বন্ধ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন কাজই হোল না।
পাওয়ার প্যানেলে তাকালাম। সংকেত পেলাম, অনেকগুলো ভি-জেট এই দিকেই আসছে। বুঝতে পারলাম এখুনি এখান থেকে বের হতে হবে আমাকে। নিচে নেমে এলাম। একটা সিটিজিতে উঠে পড়লাম, দেরি না করে এটারনিয়ার ওয়েস্ট জোন অভিমুখে রওনা করলাম। অচেনা কণ্ঠের মালিক ফ্যাটকে হয়তো সেখানে পাব। হয়তো সে আমাকে সাহায্য করতে পারবে।

এটারনিয়ার ওয়েস্ট জোনে ফ্যাটের সাথে দেখা হোল আমার। বুমারও রয়েছে ওর সাথে।
– “মাস্টার, আপনার একটি মুল্যবান জিনিস আমার কাছে রয়েছে। আপনি অনুমুতি দিলে আমি ট্র্যান্সফার করতে পারি।” ফ্যাট আনুমতি চাইল।
আমি বুমারের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়াল সে। আমার ব্লুটুথ সিস্টেমটি সক্রিয় করলাম।

মেমরিটি পাওয়ার পর প্রথমেই একটা প্রশ্ন মাথায় আসলো “এপ্রিল কোথায়?” পরক্ষনেই বুঝতে পারলাম। ও নেই। চলে গেছে। চিরতরে চলে গেছে। একটা চিৎকার বেরল মুখ দিয়ে। আমিই যে ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছি। আমারই অজ্ঞতা, আমার মেমরির অনুপস্থিতি শেষ করে দিয়েছে ওকে।

এপ্রিল এটারনিয়ার নিজস্ব/ইনহেরিট প্রোগ্রাম। ওর সিস্টেম এটারনিয়ার বাইরে কোনদিন কাজ করবে না। ওকে কেবল এটারনিয়ার উপযোগী করেই কোড করা হয়েছিল। এটারনিয়ার বাইরে ওর সিস্টেমের কোন অস্তিত্ব টিকবে না। অথচ এই আমিই ওকে যেতে দিয়েছি। ও তো যেতে চায়নি!
ওর কথাটিও রাখিনি আমি! যদি ওর কথাটি রাখতাম! একবার রাখতাম!

এপ্রিল সবসময় বিশ্বাস করত এটারনিয়ার বাইরে অন্য দুনিয়া আছে। কারন আমি এটারনিয়ার বাইরে থেকে এসেছি। কিন্তু পৃথিবী আর ফায়ার ওয়ালের ওপাশের স্থান যে এক নয়, সেটা কখনোই বুঝতে পারত না ও। এপ্রিল ভুল ছিল। ভয়াবহভাবে ভুল ছিল। আর ভুল ছিলাম আমি।
আজ চিরদিনের জন্য হারিয়েছি ওকে। আমার কাছে আর কোন দিন ফেরত আসবে না ও!

এখন বুঝতে পারছি, আমার যে অনুভূতিটি ওর জন্য সবসময় কাজ করত, সেটা আর কিছুই না, ভালবাসা! যদি এটা একবার বুঝতে পারতাম। যদি আমার মেমরিটা আমার কাছে থাকতো!


বিঃ দ্রঃ এটি একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। এখানে উল্লেখিত সকল চরিত্র কাল্পনিক। 

No comments

আপনার মুল্যবান মন্তব্য এখানে লিখতে পারেন। ধন্যবাদ।

Theme images by Storman. Powered by Blogger.