সব চেয়ে বড় হলো মনের জোর


সব চেয়ে বড় হলো মনের জোর 



প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী স্যার অ্যাডমন্ড পার্সিভ্যাল হিলারি ২০ জুলাই ১৯১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে তিনি ও শেরপা গাইড তেনজিং নোরগে সর্বপ্রথম এভারেস্ট জয় করেন। এর আগে পৃথিবীর সর্বোচ্চ এই পর্বতশৃঙ্গকে জয় করা মানুষের সাধ্যের বাইরে মনে করা হতো। ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারি স্যার এডমন্ড হিলারির মৃত্যু হয়।

সে সময় নিউজিল্যান্ডে ছেলেমেয়েরা হাইস্কুলে ভর্তি হতো মোটামুটি ১৩ বছর বয়সে। কিন্তু আমি প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সেই হাইস্কুলে ঢুকে পড়ি। আর এমনটা হবেই বা না কেন? আমার মা ছিলেন আমাদের ছোট্ট অকল্যান্ডের একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি আমার লেখাপড়ার বিশেষ যত্ন নিতেন সব সময়। তাই ওই অল্প বয়সেই আমি বেশ ভালো ছাত্র হয়ে উঠি আর ক্লাসে অটো প্রমোশন পেয়ে ১১ বছর বয়সেই হাইস্কুলে ঢুকে পড়ি। তাও আবার নিউজিল্যান্ডের সেই সময়ের সবচেয়ে সেরা স্কুলগুলোর একটায়। যাই হোক, সেখানে গিয়ে দেখি ক্লাসের সবাই আমার থেকে বেশ বড়। আমাকে ওদের মাঝে বেশ ছোট ছোট মনে হতো। তবে বছর খানেকের মধ্যে আমিও ধীরে ধীরে লম্বা হয়ে উঠলাম। শক্তিশালীও হলাম। নিজের হারানো আত্মবিশ্বাস এভাবেই ফিরে পেলাম। ফলাফল ভালো হতে শুরু করলো ঠিক আগের মতো।
আমি যে অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলাম, তা কিন্তু নয়। আমি আসলে এমন ছাত্র ছিলাম, যে কিনা সব সময় নিজের প্রয়োজনীয় লেখাপড়াটা ঠিকভাবে, ঠিক সময়ে করে রাখত। বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমি এই স্বভাবটা পেয়েছি। তাদের দুজনেই নীতির দিক থেকে ছিলেন আপসহীন। বাবা একটা ছোট্ট পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। শুধু সম্পাদনা বললে অবশ্য ভুল হবে; তিনি একাধারে ওই পত্রিকার মালিক, প্রকাশক, সম্পাদক, প্রতিবেদক, আলোকচিত্রী—সব ছিলেন। শুধু ঘরে ঘরে পত্রিকা বিলি করার কাজটাই করতে হতো না বাবাকে।

সে সময় দুর্ভিক্ষ শুরু হল। অসৎ কিছু ব্যবসায়ী খাদ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লোটার চেষ্টা করছিল। বাবা এ নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছিলেন নিজের পত্রিকায়। আমি যদি কোনো দিন খেতে বসে খাবার নষ্ট করার চেষ্টা করতাম, তাহলে মা আমাকে মনে করিয়ে দিতেন এশিয়া মহাদেশের এমন অনেক হতদরিদ্র মানুষের কথা, যারা কিনা খাবারের অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তখন ছোট্ট আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না যে আমি খাবার নষ্ট করলে ওই সব দুর্ভাগা মানুষের কী সমস্যা। অবশ্য বড় হয়ে যখন বুঝতে পেরেছি আসল সমস্যাটা, তখন চেষ্টা করেছি ওই সব হতভাগা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।

আজ আমাকে বিশ্ববাসী চেনে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের জন্য। কিন্তু সত্যি বলতে কি, মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের পরে যে বিশ্ববাসীর এত ভালবাসা, সন্মান পাব, তা আমি কখনোই ভাবিনি। আর তার চাইতেও বড় কথা, আমি যে কোনো দিন এভারেস্ট জয় করব, সেটাই কখনো চিন্তা করিনি। এমনকি যখন আমি মাউন্ট এভারেস্টের পাদদেশ থেকে যাত্রা শুরু করি, তখনো আমি সংশয়ে ছিলাম এ ব্যাপারে। আমি জানতাম না, আসলে কোনো মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব কিনা মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা।

কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবহার করেও বরফে ঢাকা বিপৎসংকুল ২৯ হাজার ৩৫ ফুট উঁচু কোনো পর্বত পাড়ি দেওয়াটা কোনো সহজ কাজ ছিল না কখনোই। আর শুধু ওপরে উঠলেই তো হয়ে গেল না! ওপরে উঠে আবার নিচেও নেমে আসতে হবে ওই বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে। পৌঁছানোর মাত্র ৩০ ফুট আগেও জানতাম না চূড়ায় পা রাখতে পারব কিনা আদৌ! এমনো হতে পারত, হয়তো চূড়ায় পা রেখেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছি বা নেমে আসার সময় বরফের কোনো গুপ্ত ফাটলের নিচে সমাধি হতে পারত। পুরো অভিযান শেষে নিচে নেমে আসার আগ পর্যন্ত জানতাম না এটা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব কি না। কিন্তু একটা কথা সত্য, আমি এক মুহূর্তের জন্যও মনোবল হারাইনি অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। আমি তো মনে করি, যেকোনো কাজ সফলভাবে করার জন্য যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো মনোবল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে শারীরিক সামর্থ্য, কারিগরি দক্ষতা, এমনিকি টাকা-পয়সারও প্রয়োজন রয়েছে অবশ্যই, কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রয়োজনটা হলো মনের জোর। কঠোর মনোবল, দৃঢ় সংকল্প, প্রবল উৎসাহ ছাড়া কোনো কাজই ঠিকভাবে করা সম্ভব নয়। এটাই আসলে মূল পার্থক্য গড়ে দেয় একজন সাধারণ মানুষ আর একজন বিখ্যাত মানুষের মধ্যে।

ছোটবেলায় পড়া হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড, জর্জ হায়ারের বই পড়ে আমার সময় কাটত। আমি এসব বই পড়ে শক্তি পেতাম। আমার মনোবল শক্ত হয়েছে এভাবেই। আমি মনে করি, খুব বেশি মেধাবী হওয়ার দরকার নেই বিশেষ কিছু হওয়ার জন্য, বা বিখ্যাত হওয়ার জন্য। তরুণদের প্রতি আমার উপদেশ হলো, তোমরা সব সময় বড় কিছু চিন্তা কোরো। বড় কিছু পাওয়ার চেষ্টা কোরো। হয়তো একবারে পারবে না, দুবারেও পারবে না, কিন্তু একসময় বিজয় আসবেই। কোনো কাজ বারবার চেষ্টা করলে সেই কাজের ওপর আরও বেশি দখল আসে। সেই কাজ করা আরও বেশি সহজ হয়ে যায়। যেকোনো কিছু জয় করার সামর্থ্য রয়েছে তোমার। বিশেষ কিছু করতে হলে বিশেষ কোনো মানুষ হতে হবে, তা নয় মোটেও। আমি মনে করি, যে কারও পক্ষে সম্ভব যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করা।

No comments

আপনার মুল্যবান মন্তব্য এখানে লিখতে পারেন। ধন্যবাদ।

Theme images by Storman. Powered by Blogger.